✏️ এম.এ. আজিজ
কারোর সাথে কারো কোনো বিষয়ে মতানৈক্য কিংবা বিরোধ দেখা দিলেই তাকে যেকোনো উপায়ে ঘায়েল করার আপ্রাণ চেষ্টা করা হয় এবং এতে সফল হওয়ার জন্য বিভিন্ন কলা কৌশল অবলম্বন করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান কৌশল হলো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কুফরী কিংবা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ । এই কু-প্রথা আলেম সমাজের মধ্যে প্রচলিত হলেও এখন দেখা যাচ্ছে সাধারণ মানুষও পিছিয়ে নেই। এ ক্ষেত্রে তাঁদের খুব বেশি বেপরোয়াই দেখা যায়। তাঁরা এই ধরনের অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢালাওভাবে প্রচার করে থাকেন। অথচ আমাদের পূর্ববর্তী সত্যনিষ্ঠ আলিমরা কারো উপর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত কিংবা কুফরীর অভিযোগ আনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। কোনো মুসলমান বা মুসলমানের নিদর্শন পাওয়া যায় এমন কাউকে কাফির ঘোষণার বিষয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ أَلْقَىٰ إِلَيْكُمُ السَّلَامَ لَسْتَ مُؤْمِنًا
(হে মুমিনগণ!) আর যে তোমাদেরকে সালাম দেয়, তাকে তোমরা এ কথা বলো না যে, তুমি মু’মিন না। [সূরা-নিসা, আয়াত:৯৪]
• কোনো মুসলমানকে কাফির বলতে গিয়ে কঠোর সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ স্বরূপ রাসূল কারীম (ﷺ) বলেন,
أَيُّما امْرِئٍ قالَ لأَخِيهِ: يا كافِرُ، فقَدْ باءَ بها أحَدُهُما، إنْ كانَ كما قالَ، وإلّا رَجَعَتْ عليه.
” কোনো ব্যক্তি তাঁর ভাইকে (অন্য মুসলিমকে) ‘কাফির’ বলে সম্বোধন করলে তাদের দুজনের যেকোনো একজন তার সম্মুখীন হবে (যোগ্য হবে)। যাকে ‘কাফির’ বলা হয়েছে সে যদি প্রকৃতপক্ষে কাফির হয়, তাহলে কোনো সমস্যা নেই। আর যদি সে কাফির না হয়, তাহলে আহ্বানকারী নিজেই এ সম্বোধনের উপযোগী হবে। [সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং-২২৫]
• অপর বর্ণনায় এসেছে, রাসূল কারীম (ﷺ) বলেন,
وَمَنْ رَمَى مُؤْمِنًا بِكُفْرٍ فَهْوَ كَقَتْلِهِ
“আর যে ব্যক্তি কোনো মু’মিনের প্রতি কুফরীর অভিযোগ করলো, সে যেন প্রকারান্তরে যেন তাকে হত্যা করল।”[সহীহ বুখারী, হাদীছ নং-৬১০৫]
• অপর বর্ণনায় এসেছে, রাসূল কারীম (ﷺ) বলেন,
من دعا رجلًا بالكفرِ، أو قال: عدوُّ اللهِ، وليس كذلك إلا حارَتْ عليه
” যে ব্যক্তি কাউকে কাফির বলে সম্বোধন করল অথবা বললো আল্লাহর শত্রু, অথচ সে ব্যক্তি বাস্তবিকপক্ষে তা নয়, তাহলে উক্ত বাক্য সম্বোধনকারীর দিকে প্রত্যাবর্তন করবে।[সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং-২২৬]
• অপর বর্ণনায় এসেছে, রাসূল কারীম (ﷺ) বলেন,
ثلاثٌ من أصلِ الإيمانِ الكفُّ عن من قال لا إلهَ إلّا اللهُ ولا نكفِّرْه بذنبٍ ولا نُخرجْه من الإسلامِ بعملٍ
” তিনটি বিষয় মূল ইমানের অন্তর্ভুক্ত। সেগুলো হল- যে ব্যক্তি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর ঘোষণা দেবে, আমরা(যুদ্ধক্ষেত্রে) তাকে আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকবো, গোনাহের কারণে আমরা তাকে কাফির বলবো না এবং কোনো আমালের কারণে তাকে ইসলাম থেকে বের করে দেবো না। [সুনানু আবী দাউদ, হাদীছ নং-২৫৩৪]
ইমাম আবু জাফর আত্ ত্বাহাভী (রা:) হানাফী ইমামগণ থেকে বর্ণনা করেন,
لا يخرج الرجل من الايمان الا جحود ما ادخله فيه
“কোনো ব্যক্তি যে সকল বিষয় স্বীকার করার মাধ্যমে ইমানদার হয়েছে, সে সকল বিষয় অস্বীকার করা ব্যতীত অন্য কোনো কারণ তাকে ইমান থেকে বাহির করবে না তথা কাফির হবে না।”
অতঃপর অস্বীকারকৃত বিষয়ের যথাযথ প্রমাণ সাব্যস্ত করণ সম্পর্কে আলেমগণের অভিমত বর্ণনায় ইমাম ত্বাহাভী (রা:) বলেন,
ثم ما تيقن انه ردة يحكم بها، وما يشك أنه ردة لا يحكم بها
“অতঃপর যখন সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হবে যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি ধর্ম ত্যাগ করেছে, তাহলে তার উপর কুফরীর ফাতাওয়া আরোপ করা যাবে। আর যদি এক্ষেত্রে (কুফরী প্রমাণের) কোনো ধরনের সন্দেহের অবকাশ থাকে, তাহলে তার উপর কুফরীর ফাতাওয়া আরোপ করা যাবে না।” এর কারণ বর্ণনায় তিনি বলেন,
اذ الاسلام ثابت لا يزول بالشك
“যখন কারো মধ্যে ইসলাম সাব্যস্ত হয় অর্থাৎ যখন কেউ মুসলমান বলে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়, তখন তা সন্দেহমূলক বিষয়ের দ্বারা দূরীভূত হয় না।”
এক্ষেত্রে মুফতী বা আলেমদের উদ্দেশ্য আমাদের মাজহাবের ইমামগণের নির্দেশনা বর্ণনায় ইমাম ত্বাহাভী (রা:) বলেন,
وينبغي للعالم إذا رفع إليه هذا أن لا يبادر بتكفير أهل الاسلام
“আর আলেমের (ফাতাওয়াদানকারী মুফতীর) উচিত, যখন তাঁর কাছে এই ধরনের বিষয় (কুফরীর মাস’আলা) উপস্থাপন করা হবে, তখন তিনি যেন কোনো মুসলমানকে কাফির বলে ফাতাওয়া দিতে গিয়ে তাড়াহুড়া না করেন।”[ইবনে আবেদীন রা., রদ্দুল মুখতার, কিতাবুল জিহাদ, বাবুল মুরতাদ, খ.৬, পৃ.৩৫৮]
ফাতাওয়া তাতারখানিয়ার বরাতে রদ্দুল মুখতার (ফাতাওয়া শামী) প্রণেতা আল্লামা ইবনে আবেদীন (রা:) বলেন,
لا يكفر بالمحتمل
“কোনো সম্ভাবনাময় বিষয়ের কারণে কাউকে কাফির ঘোষণা করা যাবে না।”[রদ্দুল মুখতার, কিতাবুল জিহাদ, বাবুল মুরতাদ, খ.৬, পৃ.৩৫৮]
এ বিষয়ে প্রায় সকল ফকীহ’র অভিমত হলো-
إذا كان في المسألة وجوه توجب التكفير، ووجه واحد يمنعه، فعلى المفتي أن يميل إلى الوجه الذي يمنع التكفير تحسينًا للظن بالمسلم.
” যদি মাস’আলায় কাউকে কাফির ঘোষণা করার বহু উপলক্ষ পাওয়া যায় এবং শুধুমাত্র একটি উপলক্ষ এমন পাওয়া যায় যার উপর ভিত্তি করে কাফির বলা যাবে না, তাহলে মুফতীর জন্য আবশ্যক যে, মুসলমানের প্রতি সুধারণা পোষণ করত সে-ই (কাফির না হওয়ার) উপলক্ষকেই গ্রহণ করা।” [ইবনে নুজাইম রা., আল-বাহরুর্ রা’য়েক শরহু কানযূদ্ দাক্বায়েক, কিতাবুস্ সিয়ার, বাবু আহকামিল মুরতাদ, খ.৫, পৃ.১৩৫, ইবনে আবেদীন রা., রদ্দুল মুখতার, কিতাবুল জিহাদ, বাবুল মুরতাদ, খ.৬, পৃ.৩৫৮]
জামেউল ফুসূলাইন এবং আল-ফাতাওয়া আস্ সুগরা এর রেফারেন্সে আল্লামা ইবনে আবেদীন (রা:) তাঁর বিশ্ববিখ্যাত কিতাব রদ্দুল মুখতারে (ফাতাওয়া শামী) উল্লেখ করেন,
الكفر شيء عظيم، فلا أجعل المؤمن كافرا متى وجدت رواية انه لا يكفر
” কাউকে কাফির ঘোষণা করা অনেক বড় বিষয়। তাই আমি যতক্ষণ কুফরী সাব্যস্ত না হওয়া বিষয়ে একটি বর্ণনাও পাবো, ততক্ষণ কখনো কোনো মু’মিনকে কাফির বানাবো না।[ইবনে আবেদীন রা., রদ্দুল মুখতার, কিতাবুল জিহাদ, বাবুল মুরতাদ, খ.৬, পৃ.৩৫৮]
এ বিষয়ে ইমাম আবু হামেদ আল-গাযালী (রা:) আলেমদের প্রতি অসিয়্যত স্বরূপ বলেন,
اما الوصية، فان تكف لسانك عن أهل القبلة ما امكنك ما داموا قائلين : لا اله إلا الله محمد الرسول الله. [فيصل التفرقة بين الإسلام والزندقة، ص:195]
অতঃপর অসিয়্যত হল- তুমি যথাসম্ভব মুসলিমকে কাফির বলা থেকে নিজের জিহ্বাকে বিরত রাখবে, যে যাবৎ তারা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ্” বলে। [গাযালী রা. ফাইসালুত্ তাফরিকা বাইনাল কুফরী ওয়ায্ যিনদিক্বাহ, পৃ.১৯৫]
প্রকৃতপক্ষে কোনো বিষয় পরিষ্কারভাবে বুঝানোর জন্য কোনো বিখ্যাত ও সুপরিচিত কিছুর তুলনা তুলনা কিংবা সাদৃশ্য উপস্থাপন পবিত্র কুরআনের অনেক আয়াতে লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন উলুমুল কুরআন গ্রন্থে আমছালুল কুরআন নামে অধ্যায়ও সংযোজন করা হয়েছে। যেমন,
নবী কারীম (ﷺ) বলেন,
إن القرآن نزل على خمسة أوجه: حلال وحرام، ومحكم، ومتشابه، وأمثال. فاعملوا بالحلال، واجتنبوا الحرام، واتبعوا المحكم، وآمنوا بالمتشابه، واعتبروا بالأمثال
“নিশ্চয়ই কুরআন পাঁচভাবে নাজিল হয়েছে: হালাল ও হারাম, স্পষ্ট (মুহকাম), অস্পষ্ট (মুতাশাবিহ), এবং উদাহরণসমূহ (আমসাল)। অতএব, হালালকে অনুসরণ করো, হারাম থেকে বিরত থাকো, স্পষ্ট (মুহকাম) বিধান অনুসরণ করো, অস্পষ্ট (মুতাশাবিহ) বিষয়ে ঈমান আনো, এবং উদাহরণসমূহ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো।” [বায়হাকি: ২২৯৩]
মূলত তুলনা কিংবা সাদৃশ্য উপস্থাপন করা হয় কোনো অবস্থাকে মনের মধ্যে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য; কারণ যার মাধ্যমে তুলনা করা হয়, তা তুলনীয় বিষয়ের চেয়ে স্পষ্টতর হতে পারে, অথবা মানুষের মন পূর্ব থেকেই সেটির সঙ্গে পরিচিত ও অভ্যস্ত থাকতে পারে। যেমন, আল্লাহ তা’আলা রিয়া (লোক দেখানো) করে দানকারীর অবস্থার উদাহরণ দিয়েছেন, যে তার দান থেকে কোনো সওয়াব লাভ করতে পারে না। আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُبْطِلُوا صَدَقَاتِكُم بِالْمَنِّ وَالْأَذَىٰ كَالَّذِي يُنفِقُ مَالَهُ رِئَاءَ النَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَمَثَلُهُ كَمَثَلِ صَفْوَانٍ عَلَيْهِ تُرَابٌ فَأَصَابَهُ وَابِلٌ فَتَرَكَهُ صَلْدًا لَّا يَقْدِرُونَ عَلَىٰ شَيْءٍ مِّمَّا كَسَبُوا وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের দান-খয়রাত নষ্ট কোরো না অনুগ্রহ প্রকাশ ও কষ্ট দেওয়ার মাধ্যমে, সেই ব্যক্তির মতো, যে মানুষকে দেখানোর জন্য তার সম্পদ ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে না। তার দৃষ্টান্ত একটি মসৃণ পাথরের মতো, যার ওপরে কিছু মাটি রয়েছে, এরপর প্রবল বৃষ্টি তা আঘাত করলে সেটিকে সম্পূর্ণ পরিষ্কার ও শক্ত করে ফেলে। তারা যা অর্জন করেছে, তার কিছুই তারা লাভ করতে পারবে না। আর আল্লাহ কাফির সম্প্রদায়কে সঠিক পথে পরিচালিত করেন না।” [সূরা আল-বাকারা: ২৬৪]
অতএব, লোক দেখিয়ে দানকারীর অবস্থাকে তুলনা করা হয়েছে মসৃণ পাথরের সঙ্গে, যার ওপরে কিছু মাটি থাকে। এরপর যখন প্রবল বৃষ্টি সেটিকে আঘাত করে, তখন সেই মাটিকে সম্পূর্ণ ধুয়ে ফেলে। তেমনই রিয়া (প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে) করা আমলগুলোর অবস্থা—এগুলো সেই মাটির মতো, যা পাথরের ওপরে ছিল; কিন্তু তা বৃষ্টির সঙ্গে বিলীন হয়ে যায় এবং কোনো প্রতিদান পাওয়া যায় না। এই দৃষ্টান্তের মাধ্যমে লোক দেখানো দানকারীর ব্যর্থতা অত্যন্ত গভীর ও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
এছাড়াও, কোনো ভালো কাজের প্রতি উৎসাহিত করতেও এরকম শব্দ ব্যবহার করা হয়; যেখানে তুলনীয় বস্তুটি এমন কিছু হয়, যা মানুষের মন পছন্দ করে এবং যার প্রতি আগ্রহী হয়। যেমন, আল্লাহ তা’আলা তাঁর রাস্তায় দানকারীদের অবস্থার উদাহরণ দিয়েছেন, যেখানে দানের ফলে তাদের জন্য বিপুল কল্যাণ ফিরে আসে। তিনি বলেন:
مَثَلُ الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنبُلَةٍ مِّائَةُ حَبَّةٍ ۗ وَاللَّهُ يُضَاعِفُ لِمَن يَشَاءُ ۗ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ.
“যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের দৃষ্টান্ত একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শীষ গজায়; প্রতিটি শীষে একশত করে বীজ থাকে। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহ মহাঅর্থবান, সর্বজ্ঞ।” [সূরা আল-বাকারা: ২৬১]
এছাড়াও, কোনো কাজ থেকে বিরত রাখার জন্যও এরকম শব্দ ব্যবহার করা হয়; যেখানে তুলনীয় বস্তুটি এমন কিছু হয়, যা মানুষের মন ঘৃণা করে এবং তা থেকে দূরে থাকতে চায়। যেমন, আল্লাহ তা’আলা গীবতকারীর (পরনিন্দাকারীর) অবস্থার উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিক ধারণা করা থেকে বিরত থাকো, কারণ কিছু কিছু ধারণা পাপ। এবং তোমরা পরস্পরের গোপন বিষয় অনুসন্ধান কোরো না এবং কেউ কারো গীবত কোরো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের মাংস ভক্ষণ করতে পছন্দ করবে? তোমরা তো অবশ্যই একে ঘৃণা করবে! সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।” [সূরা আল-হুজরাত: ১২]
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, মানুষের স্বভাব মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়া থেকে অত্যন্ত ঘৃণা ও বিরক্তি বোধ করে। তদ্রূপ, গীবতের ক্ষেত্রেও মানুষের উচিত একই রকম ঘৃণা ও বিরত থাকা।
এছাড়াও, প্রশংসার জন্যও এরকম শব্দ ব্যবহার করা হয়, যেখানে তুলনীয় বস্তুটি এমন কিছু হয়, যা মানুষের মন ভালোবাসে এবং যে ব্যক্তি তা অর্জন করে, তাকে প্রশংসিত মনে করে। যেমন, আল্লাহ তা’আলা সাহাবাদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) অবস্থার উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন:
مُّحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ ۚ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ ۖ تَرَاهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا ۖ سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِم مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ ۚ ذَٰلِكَ مَثَلُهُمْ فِي التَّوْرَاةِ ۚ وَمَثَلُهُمْ فِي الْإِنجِيلِ كَزَرْعٍ أَخْرَجَ شَطْأَهُ فَآزَرَهُ فَاسْتَغْلَظَ فَاسْتَوَىٰ عَلَىٰ سُوقِهِ يُعْجِبُ الزُّرَّاعَ لِيَغِيظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ ۗ وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ مِنْهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا
“মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আর যারা তাঁর সঙ্গে আছে, তারা কাফিরদের প্রতি কঠোর, কিন্তু নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি দয়াশীল। তুমি তাদের দেখবে—তারা রুকু করে, সিজদা করে, আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে। তাদের চেহারায় সিজদার চিহ্ন বিদ্যমান। এটাই তাদের উদাহরণ তাওরাতে। আর ইনজিলে তাদের দৃষ্টান্ত এমন, যেমন একটি শস্যবীজ, যা থেকে চারা বের হয়, তারপর তা শক্তিশালী হয়, তারপর মোটা হয়ে ওঠে এবং নিজের কান্ডের ওপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে যায়—যা কৃষকদের চমৎকৃত করে; যাতে এর মাধ্যমে কাফিরদের অন্তরে ক্রোধ সৃষ্টি হয়। আল্লাহ তাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, তাদেরকে ক্ষমা ও মহাপুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।” [সূরা আল-ফাতহ: ২৯]
এই দৃষ্টান্তে সাহাবাদের ঈমানের দৃঢ়তা, শক্তি ও প্রগতি বর্ণনা করা হয়েছে, যা প্রশংসার উপযুক্ত। শস্য প্রথমে কুঁড়ি (শটঅ) বের করে, যা তার দুই পাশে শাখা-প্রশাখার মতো বিস্তৃত হয়। এরপর তা শক্তিশালী হয় এবং মোটা হয়ে ওঠে—অর্থাৎ, প্রাথমিকভাবে সূক্ষ্ম ও কোমল থাকলেও পরবর্তীতে তা দৃঢ় ও শক্তিশালী হয়ে যায়। তেমনি সাহাবাদের অবস্থাও ছিল। প্রথমদিকে তারা সংখ্যায় কম ছিলেন, কিন্তু ধীরে ধীরে তারা বৃদ্ধি পেতে থাকেন, শক্তিশালী হন এবং ইসলামের অবস্থান সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের মহত্ত্ব ও শক্তি দেখে মানুষের হৃদয় প্রশংসায় ভরে যায়।
এছাড়াও, কোনো বিষয়ে যুক্তি ও প্রমাণ উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও এরকম শব্দ ব্যবহার করা হয়। যেখানে তুলনীয় বস্তুটি স্বীকৃত ও স্পষ্ট হয়, এবং তুলনার মাধ্যমে সত্য গ্রহণ করা অনিবার্য হয়ে পড়ে। যেমন, আল্লাহ তা’আলা এক উদাহরণ দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, একমাত্র তিনিই সত্য ইলাহ (উপাস্য), আর মূর্তিগুলো কোনোভাবেই উপাসনার যোগ্য নয়। তিনি বলেন:
ضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا عَبْدًا مَّمْلُوكًا لَّا يَقْدِرُ عَلَىٰ شَيْءٍ وَمَن رَّزَقْنَاهُ مِنَّا رِزْقًا حَسَنًا فَهُوَ يُنفِقُ مِنْهُ سِرًّا وَجَهْرًا ۖ هَلْ يَسْتَوُونَ ۚ الْحَمْدُ لِلَّهِ ۚ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْلَمُونَ.
“আল্লাহ একটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন—একজন দাস, যে অন্যের সম্পত্তি এবং কোনো কিছু করার সামর্থ্য রাখে না, আর অন্যজন, যাকে আমি আমার পক্ষ থেকে উত্তম রিজিক দিয়েছি, এবং সে তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে। তারা কি সমান হতে পারে? সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা জানে না।” [সূরা আন-নাহল: ৭৫]
এই দৃষ্টান্তে বোঝানো হয়েছে যে, শক্তিহীন দাস ও স্বাধীন, দানশীল ব্যক্তি যেমন সমান হতে পারে না, তেমনি সৃষ্টিজগতে একমাত্র রিজিকদাতা আল্লাহর সঙ্গে নির্বাক ও শক্তিহীন মূর্তিগুলোর তুলনাও চলে না। এই দৃষ্টান্তের মাধ্যমে আল্লাহ প্রমাণ করেছেন যে, মূর্তিগুলো তাদের উপাসকদের কোনো উপকার করতে অক্ষম। কারণ তিনি তাদের অবস্থা তুলনা করেছেন এক সম্পূর্ণ নির্ধারিত ও অক্ষম দাসের সঙ্গে, যে নিজে কিছুই করার ক্ষমতা রাখে না। একই সঙ্গে, আল্লাহ তাঁর অসীম ক্ষমতার দিকেও ইঙ্গিত করেছেন। তিনি মূর্তিগুলোর প্রতীক হিসেবে অক্ষম দাসকে তুলে ধরেছেন, আর তার বিপরীতে এমন একজন ব্যক্তির দৃষ্টান্ত দিয়েছেন, যার রিজিক প্রশস্ত হয়েছে এবং সে ইচ্ছেমতো তা ব্যয় করতে পারে। সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন কোনো মানুষই এমন অক্ষম সত্তাকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করবে না, বরং সেই মহান সত্তাকেই উপাসনা করবে, যিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাশালী।
কক্সবাজার সিটি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মহোদয় কক্সবাজার জেলা বিএনপির (উখিয়ার) রাজনীতির প্রচার প্রসার প্রসঙ্গে বলেছেন, “উখিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনের আমি মক্কা মনে করি শাহজাহান চৌধুরীর এই বাড়িটাকে”। অর্থাৎ তিনি সাধারণ মানুষকে বুঝাতে চেয়েছেন এটা একটা রাজনীতির তীর্থস্থান । প্রাথমিক যুগে ইসলামের প্রচার প্রসার যেমনিভাবে শুরু হয়েছিল মক্কা থেকে, তেমনিভাবে উখিয়া বিএনপির (রাজনীতির) প্রচার প্রসার শুরু হয়েছিল শাহজাহান চৌধুরীর বাড়ি থেকে। তিনি মূলত এই দৃষ্টিকোণ থেকেই কথাটি বলেছেন। সাহিত্যের ভাষায় এরকম তুলনাকে Metaphor (মেটাফোর) বলা হয়। মেটাফোর হলো রূপক বা উপমা, যেখানে দুটি জিনিসের তুলনা সরাসরি করা হয়, কিন্তু “যেমন” বা “তুল্য” শব্দগুলো ব্যবহার করা হয় না।
সাহিত্য থেকে মেটাফোরের উদাহরণ:
1. “All the world’s a stage, and all the men and women merely players.”
— *William Shakespeare, As You Like It
“সমগ্র পৃথিবী একটি মঞ্চ, আর সকল মানুষ অভিনেতা মাত্র।” (এখানে জীবনকে সরাসরি একটি মঞ্চের সাথে তুলনা করা হয়েছে।)
2. “Hope is the thing with feathers.”
— Emily Dickinson
“আশা হলো পালকযুক্ত একটি বস্তু।” (এখানে আশাকে সরাসরি পালকযুক্ত পাখির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যা উড়ে যেতে পারে।)
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে দ্বীন বুঝার তাওফিক দান করুন!